প্রথম অধ্যায় সবুজ জেডের আস্তানা (উর্ধ্বাংশ)
এই পৃথিবীর আকাশ আর মাটির সৃষ্টির মধ্যেই চিরকাল অদ্ভুত ও বিস্ময়কর রহস্য লুকিয়ে আছে। দেবতাপাহাড়ের চূড়া এক রহস্যময় ও ভয়ংকর শক্তিতে ঢাকা, কেউ সেখানে পা রাখতে সাহস পায় না। তবে পাহাড়ের পাদদেশে এসে সেই শক্তির প্রভাব ধীরে ধীরে কমে যায় এবং তখনই ঘটে এক আশ্চর্য রূপান্তর। দেবতাপাহাড়কে কেন্দ্র করে সহস্র মাইলব্যাপী এক বিশাল বৃত্তাকার অঞ্চলে গড়ে উঠেছে এই প্রাচীন মহাদেশের সবচেয়ে প্রাণবন্ত অথচ ভয়ঙ্কর অরণ্যপ্রান্তর। এখানে মহাদেশের অন্য যেকোনো স্থানের তুলনায় অগণিত শক্তিশালী দানবেরা বাস করে।
দেবতাপাহাড়ের গভীর থেকে উৎসারিত অষ্টাদশ নদী এই বিস্তৃত ভূমি, যাকে বলা হয় 'দেবতাপাহাড় অন্তর্বৃত্ত', অতিক্রম করে বহুদূর মহাপ্রান্তর পর্যন্ত প্রবাহিত হয়েছে। সেখানে পবিত্র নগরীর অধিকারী মানবগণ পূর্বতন শক্তিশালী অরণ্যজাতি গোত্রের সঙ্গে মিলেমিশে বাস করে। মানুষের কাছে দেবতাপাহাড় অন্তর্বৃত্তের সেই রহস্যময় শক্তি চিরকাল ভয়ের হলেও, তেমনি প্রবল আকাঙ্ক্ষারও বিষয়। এমনকি বলা চলে, মানবজাতির ইতিহাসে সব স্বপ্নের সর্বোচ্চ লক্ষ্যমাত্রা এই শক্তি অর্জন।
এর পেছনে মূল কারণ মানবজাতির আদি পুরুষ, সেই কিংবদন্তি সাধক, মৃত্যুর পূর্বে রেখে গিয়েছিলেন দশটি ভবিষ্যৎবাণীতে ভরা এক অদ্ভুত পুস্তক। শোনা যায়, সেই ‘সাধারণ মানুষের পাণ্ডুলিপি’ নামের গ্রন্থের প্রথম ভবিষ্যৎবাণীতেই স্পষ্ট বলা আছে—দেবতাপাহাড়ের শিখরে রয়েছে এক মহাসম্পদ, যা মানবজাতি অর্জন করলে সমগ্র মহাদেশে কর্তৃত্ব ও অমরত্ব লাভ করবে।
এই জগতে সর্বোচ্চ ক্ষমতা আর চিরস্থায়ী জীবন—এ দু’টির চেয়ে বড় লোভ আর কিছুই হতে পারে না। তাই শত শত বছর ধরে ক্রমশ শক্তি বাড়ানো মানবজাতি দেবতাপাহাড়ে প্রবেশ করে সেই সাধক উল্লিখিত গুপ্তধন পাওয়ার স্বপ্ন দেখে এসেছে।
কিন্তু নিষ্ঠুর বাস্তবতা—দেবতাপাহাড়ে ছড়িয়ে থাকা সেই ভয়ংকর শক্তি অধিকাংশ জীবের জন্যই ধ্বংসাত্মক। সাধারণ মানুষের কথা বাদই দিন, এমনকি পূর্বপুরুষদের উত্তরাধিকারী শক্তিশালী ওঝারা পর্যন্ত সেখানে বেশিক্ষণ টিকতে পারে না; দ্রুত সেই শক্তি তাদের দেহ ধ্বংস করে নিষ্ঠুর মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়।
শুধু দেবতাপাহাড়েই নয়, তার নিচের অন্তর্বৃত্ত অঞ্চলেও—যেখানে শক্তির তেজ অনেকটাই কম—মানবজাতির বর্তমান ক্ষমতায় টিকিয়ে থাকা দুঃসাধ্য। যারা ওঝা, তারা অন্তর্বৃত্তে প্রবেশ করলেই আত্মশক্তির প্রতিক্রিয়ায় যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকে এবং শেষে নিজেরই শক্তিতে দগ্ধ হয়ে মারা যায়।
বিপরীতে, যারা ওঝা হতে পারেনি, কিন্তু দেহে প্রবল বল আছে, তারা কিছুটা সময় অন্তর্বৃত্তে টিকে থাকতে পারে। তবে শেষপর্যন্ত মৃত্যু তাদেরও অনিবার্য। এই রহস্যময় শক্তি যেন মানবজাতির চিরশত্রু—তাদের আকাঙ্ক্ষা বরাবরই কঠোর ও শীতলভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং দেবতাপাহাড়ের দ্বার বাইরে রেখেছে।
তাই যুগের পর যুগ ধরে শক্তিশালী মানুষরা গড়ে তুলেছে মহিমান্বিত পবিত্র নগরী, পরাস্ত করেছে এককালের প্রভাবশালী অরণ্যজাতিদের, দখল করেছে অগণিত ভূমি—তবু দেবতাপাহাড়ের দ্বার এক পা-ও এগোতে পারেনি।
সেই আদিকাল থেকে উত্তরসূরী হয়ে আসা স্বপ্নটা এখনও বহু দূরেরই থেকে গেছে মানবজাতির কাছে।
এই বিষাদময় পরিস্থিতি সাত দশক আগে পর্যন্ত চলতে থাকে।
তখন হঠাৎ একদিন, মানবজাতির কারও অজান্তে, দেবতাপাহাড় থেকে উৎসারিত অষ্টাদশ নদীর স্রোতে এক অদ্ভুত শিলা আবিষ্কৃত হল। তার বর্ণ সবুজাভ, নির্মলতায় জেডের মতো, তাই নাম দেওয়া হলো সবুজ-রত্ন।
সবুজ-রত্নের বিশেষত্ব—এটি একেবারে নিখুঁতভাবে সেই ভয়ংকর শক্তিকে প্রতিরোধ করে। অর্থাৎ, যদি সবুজ-রত্ন দিয়ে একটি ঘর তৈরি হয়, মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত, তবে মানুষ সেই রহস্যময় শক্তি থেকে বাঁচতে পারে।
এই আবিষ্কার মানবসমাজে তুমুল আলোড়ন তোলে। এতদিনের অস্পষ্ট স্বপ্ন হঠাৎ সবার চোখের সামনে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
ক্ষমতা ও অমরত্ব—এর চেয়ে বড় আর কী হতে পারে?
তাই এক বিশাল ও উন্মাদ পরিকল্পনা তৈরি হয় মানবজাতির শাসকদের মধ্যে। সেই স্বপ্নপূরণে তারা দেবতাপাহাড়ের দিকে এক আশ্চর্য সড়ক নির্মাণের উদ্দ্যেশ্য নেয়। পরিকল্পনাটা খুব সরল—অন্তর্বৃত্ত অঞ্চলে প্রতি পাঁচ ক্রোশ অন্তর একটি করে প্রশস্ত সবুজ-রত্নের ঘর নির্মাণ করা হবে, যেন সিঁড়ির ধাপে ধাপে মানুষ নিজের স্বপ্নের দিকে এগোতে পারে।
এই ঘরগুলোকেই মানবসমাজে ডাকা হয় ‘সবুজ-রত্ন আশ্রয়’।
※※※
এটি একটি মধ্যম আকারের সবুজ-রত্ন আশ্রয়। বাইরের রহস্যময় শক্তি প্রতিরোধে রাতে সমস্ত দরজা-জানালা সম্পূর্ণ বন্ধ করে রাখা হয়, ভোর না হওয়া পর্যন্ত কেউ খুলতে পারে না।
ইনহো অন্ধকারে ঘুম ভেঙে উঠে নিজেকে কিছুটা গুমোট অনুভব করল। মাটির তলা থেকে পিঠ বরাবর শীতল একটা স্রোত এসে গায়ে কেঁপে উঠল, সে চাদর আরও শক্ত করে জড়াল, কিছুটা আরাম পেলেও সেই শীতলতা যেন ছাড়ে না। যেন এক সূক্ষ্ম সুঁচ, যা কখনও হারায় না, কেবল মনকে অস্বস্তিতে রাখে।
ইনহো জানে, এই ঠাণ্ডা আসছে সবুজ-রত্নের মধ্য থেকে। প্রতিটি পাথর অষ্টাদশ নদীর স্রোতে যুগ যুগ ধরে গড়ে উঠেছে, তাদের স্বভাবজাতেই এই শীতলতা। এ বিষয়ে মানবজাতির কিছু করার নেই, শুধু নীরবে সহ্য করা ছাড়া।
এই সুচের মতো ঠাণ্ডা সবুজ-রত্নগুলোই ইনহো ও আরও শতাধিক মানুষের অন্তর্বৃত্তে একমাত্র আশ্রয়।
চারপাশ এখনও অন্ধকার, হাত বাড়ালেও কিছু দেখা যায় না; তবু ইনহো জানে, বাইরে ইতিমধ্যে ভোরের আলো উঠেছে, সূর্যরশ্মি দেবতাপাহাড় অন্তর্বৃত্তের মাটিতে স্পর্শ করেছে, সমস্ত প্রাণ জাগছে রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে, যদিও সঙ্গে জেগে উঠছে আরও অজানা বিপদ।
কেন গুমোট লাগে, ইনহো ধীরে ধীরে বুঝতে পারছে—কারণ, তার সঙ্গে এই অন্ধকার ঘরে রাত কাটাচ্ছে আরও সাতানব্বইজন মানুষ।
তীব্র ঠাণ্ডা, গুমোট আর অন্ধকার—এখানে থাকার অনুভূতি ভাল নয়। তবু ইনহো বিন্দুমাত্র অভিযোগ করেনি; কারণ, গতকালও এখানে মানুষের সংখ্যা ছিল একশো।
কিন্তু গতকাল দু'জন মারা গেছে।
তার মধ্যে একজন সবুজ-রত্নের পাথর টানতে গিয়ে পথের ধারে ঘাসে পড়ে গিয়েছিল। কালো লতার কাঁটা হাতে বিঁধে, আধঘণ্টার মধ্যে শরীর শক্ত হয়ে মারা যায়। আরেকজন, দিনের বেলায়, ইনহো থেকে কয়েক গজ দূরে, হঠাৎই ঝোপ থেকে বেরিয়ে আসা এক বিশাল নেকড়ে-দানবের মুখে পড়ে দ্বিখণ্ডিত হয়।
মৃত্যুর আগে তার ভয়ংকর চিৎকার, রক্তের ছিটে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ার দৃশ্য ইনহো স্পষ্ট দেখেছিল। এখনো যেন সেই রক্তের গন্ধ সে অনুভব করতে পারে।
সে চুপচাপ অন্ধকারে শুয়ে রইল, সহ্য করল যতটা পারে, অপেক্ষা করতে লাগল নতুন দিনের জন্য।
অবশেষে সেই দিন শুরু হল।
অন্ধকারে হঠাৎ আগুনের আলো ফুটে উঠল—কেউ একটি মশাল জ্বালিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে, এক লম্বা, কঠোর চেহারার মানুষ সামনে এসে গর্জে উঠল, মাটিতে শুয়ে থাকা মানুষদের ঘুম ভেঙে দিল প্রচণ্ড হাঁকডাকে, পায়ে লাথি মেরে।
“ওঠো, ওঠো, কাজে নামো!” মশাল হাতে নিয়ে সেই পুরুষের গলা ঘরে প্রতিধ্বনিত হল।
বেশ ক’জন ব্যথায় গোঙালেও কেউ প্রতিবাদ করল না, কাউকে গালাগাল দিল না। সবাই চুপচাপ উঠে, নিজের জিনিসপত্র গুছিয়ে, সঙ্গে আনা শুকনো খাবার খেতে লাগল।
আরও কিছু সময় পরে, হঠাৎ আশ্রয়ের এক দেয়াল থেকে গম্ভীর আওয়াজ উঠল। সবাই চমকে পিছু ফিরে তাকাল। বজ্রের মতো গর্জন শেষে এক ফালি উজ্জ্বল আলো অন্ধকারে ঢুকে পড়ল।
ভোর হয়েছে, দলনেতা দরজা খুলে দিল। অন্তর্বৃত্ত অঞ্চলের এই ভয়াবহ স্থানে, মানবজাতির স্বপ্নপূরণের জন্য নির্মিত মহাসড়ক চোখের সামনে উদিত হল—নতুন দিনের সূচনা।
ইনহো হাতে থাকা শেষ শক্ত কড়াই রুটি গিলল, মনে মনে প্রার্থনা করল আজ অন্তত নিরাপদে দিন পার করতে পারুক। তারপর সবার সঙ্গে বাইরে বেরিয়ে এল, ছেড়ে গেল একমাত্র নিরাপদ আশ্রয়টি।
※※※
আজকের দিনটি সুন্দর। নীল আকাশ, শুভ্র মেঘ, হিমেল বাতাস, অন্তর্বৃত্ত অঞ্চলের অরণ্য ঘন ও উর্বর, গাছপালার ফাঁকে ফাঁকে পাখির সুমিষ্ট ডাকে মুখর।
এখানে দাঁড়িয়ে থাকলে মনে হয় যেন সাধারণ কোনো পাহাড়ি অরণ্য, স্বাভাবিক আরামদায়ক পরিবেশ। তবু, এই দলটি এখানে চলার সময় সবসময় সতর্ক, আশপাশের প্রতিটি ঝোপঝাড় তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে খেয়াল রাখে।
দেবতাপাহাড়ে পৌঁছনোর এই স্বপ্নপথ নির্মাণ সহজ নয়, বরং অত্যন্ত কষ্টকর। এখানে কাজ করতে পারে না কোনো ওঝা; যারা আসতে পারে, তারা শুধু শক্তদেহী সাধারণ মানুষ। তাদের কাজ—অতি ঝুঁকিপূর্ণ।
এখন পর্যন্ত অন্তর্বৃত্ত সড়কে পনেরোটি সবুজ-রত্ন আশ্রয় গড়ে উঠেছে, কিন্তু ভেতরে যত এগোনো হচ্ছে, গতি ততই কমছে।
বিভিন্ন বিপদ ও দানবের সংখ্যা বেড়ে গেছে, দুর্ঘটনায় প্রাণহানি লেগেই আছে, ফলে পাথর সরবরাহও কঠিন।
সবুজ-রত্নের পাথর সংগ্রহ করে এক আশ্রয় থেকে অন্য আশ্রয়ে টানতে হয়। রহস্যময় শক্তির কারণে দিনে ছয় ঘণ্টার বেশি কাজ করা যায় না, তাই কাজের গতি খুবই কম।
ইনহো যে আশ্রয়ে আছে, সেটি ত্রয়োদশ নম্বর; গভীর অন্তর্বৃত্তে প্রবেশ করেছে। তবে সবচেয়ে গভীরে, পনেরো নম্বর আশ্রয়ে যারা আছে তাদের ছাড়া, বাকিদের একমাত্র কাজ—পেছন থেকে পাথর এনে সামনে পৌঁছানো, তারপর ফিরে গিয়ে আবার আনা—নিরবচ্ছিন্ন চক্র, যেন পিপঁড়ের মিছিল।