একচল্লিশতম অধ্যায় দুষ্ট আত্মার ফাঁদে ফেলা (১০০০ ভোটে অতিরিক্ত অধ্যায়!)

ডেমনের বিধি সংহিতা স্বপ্নিল হৃদয় 2649শব্দ 2026-03-20 10:19:35

সোলোন নর্দমায় পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই বুঝে গেলেন কেন এই কাজটি এতদিন মদের দোকানের নোটিস বোর্ডে ঝুলে থেকেও কেউ নিতে আসে নি। আসল কারণ একটাই—এটা অসহনীয়ভাবে দুর্গন্ধময়! পুরো নর্দমা জুড়ে যেন বহুদিন ধরে পঁচে যাওয়া পায়খানার অসহ্য গন্ধ ছড়িয়ে রয়েছে, যার তীব্রতায় তার প্রায় আগের রাতের খাবারও বমি হয়ে আসছিল।

সোলোন দাঁতে দাঁত চেপে সেই দুর্গন্ধ সহ্য করে নর্দমার ভেতরে পা বাড়ালেন। তার চোখে ছিল অন্ধকারে দেখার শক্তি, ফলে নর্দমার কালো আঁধারেও তিনি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলেন চারপাশের সবকিছু। আর ঠিক এই স্পষ্টতা তার গা গুলিয়ে উঠার কারণ হয়ে দাঁড়াল। চারপাশের দেয়াল জুড়ে স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ, নানা রঙের ছত্রাক আর শৈবালের আস্তরণ। কেবল গন্ধই নয়, বাতাসে ভাসছিল এমন এক বিশেষ গন্ধ, যা সোলোনের খুব চেনা—এটা ছিল এক ডেমনের উপস্থিতির গন্ধ!

হয়তো তার ভুল, নাকি সত্যিই, দূর থেকে ভেসে আসছিল রহস্যময় কান্নার আওয়াজ। সেই শব্দ পুরো নর্দমায় প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠছিল, শুনলেই গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায়।

দুজন শহর প্রহরী, যারা তাকে এখানে নিয়ে এসেছিল, গোপন পথে ঢোকার পর একজন চিন্তিত গলায় বলল, ‘‘শ্রদ্ধেয় শিকারি, এখানেই সেই জায়গা!’’

‘‘ভালো, এখন ওরকম লোকটাকে নিয়ে এসো, দেখি আমরা সেই জন্তুটাকে ফাঁদে ফেলতে পারি কি না,’’ নির্লিপ্ত স্বরে বলল সোলোন।

তাঁদের কথা শুনে দুই প্রহরী একজন হাত-পা বাধা লোককে টেনে আনল গোপন পথে। সে ছিল মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদি, একজন খুনি, যার অপরাধের জন্য সোলোন ডেমন শিকারি সংঘের অনুমতি নিয়ে তাকে ফাঁদ হিসেবে ব্যবহার করছিলেন।

হ্যাঁ, সোলোনের উদ্দেশ্যই ছিল এমন ‘‘চারা’’ ফেলে জন্তুটিকে টেনে বের করা!

ডেমন শিকারি সংঘের ক্ষমতা ছিল অসাধারণ; সিটি হল তাদের প্রায় সব চাহিদা পূরণ করত। সংঘের সঙ্গে নানান লড়াইয়ের ঝামেলা সামলাতে তারা সহায়তাও করত, যাতে সাধারণ মানুষেরা আতঙ্কে না কাটায়। তাই সোলোনের অনুরোধে মাত্র কয়েক মিনিটেই ওই মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদিকে অনুমোদিত করা হয়েছিল।

নর্দমা এখন অজানা ডেমনের বাসা, যেখানে মানুষ হত্যা চলছে নির্দ্বিধায়। সোলোন চাইলেন না হুট করে ঝুঁকি নিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়তে। প্রথমে বোঝা দরকার, ঠিক কোন ডেমনের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। যদি জিততে পারেন তো ভালো, না পারলে পিছু হটা—বোকা ছাড়া কেউ অন্ধের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে না!

প্রহরীরা কয়েদির হাত-পা শক্ত করে বেঁধে বড় এক পাথরে তুলে রাখল, মুখের কাপড়খানাও খুলে দিল। এসব কাজ শেষ করেই তারা আতঙ্কে দ্রুত সরে গেল, যেন যেকোনো মুহূর্তে কোনো জন্তু বেরিয়ে এসে তাদের গিলে ফেলবে।

এর আগেও তাদের দুই সহকর্মীর এমন করুণ মৃত্যু হয়েছিল, লাশও মেলেনি—শুধু মাটিতে রক্তের দাগ ছিল।

এরপর শুরু হল অপেক্ষার পালা।

সোলোন সিটি হলের দেওয়া গাড়িতে বসে আরাম করে চামড়ার সিটে, বিকেলের নাস্তার স্বাদ নিতে লাগলেন। অন্যদিকে, দুই প্রহরী নর্দমার মুখে চূড়ান্ত সতর্কতায় পাহারা দিতে থাকল।

‘‘আসলেই কি ডেমন আছে?’’ রোগাটে প্রহরী গাড়ির দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল।

অন্যজন মাথা নেড়ে বলল, ‘‘আমার কাকা বলেছিল, এমন ডেমন আছে যারা মানুষের আত্মা পর্যন্ত খেয়ে ফেলে!’’

‘‘ঈশ্বর, ওটা যদি হঠাৎ বের হয়ে আসে...’’ কথাটা শুনে রোগাটে প্রহরীর গা কাঁপতে লাগল, মুখ আরও ফ্যাকাসে হয়ে গেল।

ঠিক তখনই নিচ থেকে হঠাৎ চিৎকার ভেসে এল।

‘‘বাঁচাও! এখানে জন্তু...’’

এটা সেই কয়েদিরই চিৎকার! মাত্র দুই সেকেন্ড চলল, তারপরই তীব্র কিছু ছুরির মতো শব্দের সঙ্গে সব থেমে গেল।

জন্তুটি সত্যিই চলে এসেছে!

দুই প্রহরীর গা দিয়ে ঘাম ঝরতে লাগল, তারা কাঁপতে কাঁপতে গাড়ির ভেতরের ছায়ামূর্তির দিকে চিৎকার করে বলল, ‘‘শ্রদ্ধেয় শিকারি, জন্তুটা সত্যিই এসেছে!’’

ধপ করে গাড়ির দরজা খুলে গেল। দু’জনের সামনে সোলোন পিঠে লম্বা তরবারি, হাতে দ্বিমুখী শিকারি বন্দুক নিয়ে নর্দমার ভেতর প্রবেশ করলেন। তিনি একবারের জন্যও থামলেন না, তখনই তারা বুঝল কেন কারাগারের প্রধান এত সম্মান করে তাকে। সত্যিই, তিনি তা পাওয়ার যোগ্য!

সোলোন এক লাফে নর্দমায় নেমে কাদা পানি এড়িয়ে এগিয়ে গেলেন। তিনি দেখতে পেলেন, কয়েদির পাশে এক ভয়ানক অদ্ভুত জন্তু দাঁড়িয়ে।

ওই জন্তুটির গা ছিল ধূসর-বাদামি, সারা দেহজুড়ে পেশির পাহাড়। অথচ উচ্চতা মাত্র এক মিটার বিশ সেন্টিমিটার, দেখতে যেন এক মাংসপিণ্ডে ভর্তি বেঁটে দৈত্য!

তার মুখে কুমিরের মতো ধারালো দাঁত, হাতে মরচে ধরা এক লম্বা তরবারি, যা দিয়ে সে কয়েদির বুকে আঘাত করে সঙ্গে সঙ্গে খুন করেছে।

জন্তুটিকে দেখে সোলোন ভয় না পেয়ে বরং খুশি হলেন, বড় বড় পা ফেলে এগিয়ে গেলেন তার দিকে।

এ সময় জন্তুটির চোখ থেকে রক্তাভ অন্ধকার আলো ছড়িয়ে ভয়ানক এক মানসিক ঢেউ সোলোনের দিকে ছুটে এল। সেই ঢেউয়ে মনটা আতঙ্কে ভরে উঠল, এমনকি অজ্ঞান হয়ে যাবার মতো ভয়।

কিন্তু তার ইস্পাত দৃঢ়-ইচ্ছাশক্তি সক্রিয় হল, সে যাদু কোনো প্রভাব ফেলতে পারল না।

‘‘ভয়ভীতি জাদুর আক্রমণ হয়েছিল, কিন্তু ইস্পাত সদৃশ মনোবল তাকে রক্ষা করল!’’

এটাই সেই ক্ষমতা, যার কাছে আগের দুই বন্দুকধারী সৈনিক প্রাণ হারায়। ভয়ভীতি জাদুর কবলে পড়ে কেউই আর বন্দুক তুলতে পারে না, দেয়ালের কোণে ভয়ে কুঁকড়ে যায়—শিকারির মতো!

ঠিক এই মুহূর্তে, সোলোন সেই যাদুর কারণে মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে যাওয়া জন্তুর দিকে এগিয়ে বন্দুকের ট্রিগার টিপে দিলেন।

গর্জে উঠল বন্দুক, লোহা-ইস্পাতের গুলি ঝাঁকে ঝাঁকে গিয়ে জন্তুটিকে আচ্ছাদিত করল।

রক্তিম ইস্পাতের গুলি তার দেহ বিদীর্ণ করে ভয়ানক ক্ষত তৈরি করল।

জন্তুটি তখনই উন্মত্ত হয়ে তার দিকে ছুটে এল।

শিকারি বন্দুকের এমন আঘাতেও সে গুরুতর আহত হল না। বহুবার শিকার করার সফলতায় সে মানুষকে কেবল খাবার হিসেবেই দেখে, ভয় পায় না কিছুই।

আবার গর্জে উঠল বন্দুক, যার ফলে জন্তুটির গতি কমে গেল। তখন তার চারপাশে শক্তির ঢেউ ওঠে, হলুদ মেঘের মতো এক গন্ধ ছড়িয়ে দেয় সোলোনের দিকে। সেই গন্ধ এত ভয়ানক যে, আগের নর্দমার দুর্গন্ধকেই যেন স্বর্গীয় লাগে।

এই দুর্গন্ধে সোলোনের মাথা ঘুরে উঠল, শরীর দুর্বল হয়ে পড়ল, তাই তাড়াতাড়ি পিছু হটে সে মেঘের বাইরে এল।

ঠিক তখনই, জন্তুটি লাফিয়ে তার দিকে ছুটে এল।

টিং করে শব্দ হল, সোলোন তাড়াহুড়ো করে বন্দুক দিয়ে আঘাত প্রতিহত করলেন। অথচ ছোট্ট দেহের জন্তুটির শক্তি ছিল তার সমান, বন্দুক মুহূর্তে বেঁকে ভেঙে গেল।

সোলোন বন্দুক ফেলে দিয়ে পিঠের তরবারি বের করলেন।

তার বুকে ডান পাশে থাকা চিহ্ন আলো হয়ে রক্তিম ছটা ছড়িয়ে তরবারিকে ঢেকে ফেলল।

পরের মুহূর্তেই তরবারির গায়ে লালচে রক্তের নকশা ফুটে উঠল, ভেতর থেকে ভয়ানক রক্তের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল।

এটাই ছিল কালো জাদুর তরবারির বাস্তব ব্যবহার!

জন্তুটি আবার ছুটে এল, কিন্তু সোলোনের এক কোপে তার অস্ত্র ভেঙে গেল, তরবারি গভীরভাবে তার বাহুতে ঢুকে পড়ল।

রক্তিম আলো ফেটে বেরিয়ে জন্তুটির শরীর জুড়ে ছড়িয়ে গেল।

ভয়ানক শোষণের শক্তি প্রকাশ পেল, সেই রক্তপায়ী তরবারি জন্তুটির প্রাণশক্তি গলাধঃকরণ করতে লাগল।

কিন্তু সোলোনের আশ্চর্য, জন্তুটি তরবারির শোষণ থেকে মুক্ত হয়ে পালাল না, বরং হঠাৎ হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।

জন্তুটি মুখে কিছু বলল না, বরং মানসিক তরঙ্গ হয়ে সোলোনের মনে কথার ধারা বইয়ে দিল—

‘‘শক্তিশালী মানব, অনুগ্রহ করে আমায় ছেড়ে দাও, আমি তোমাকে অন্য ডেমনের সন্ধান দিতে পারি!’’

মানসিক যোগাযোগ!

প্রায় সব ডেমনেরই এই ক্ষমতা থাকে, এজন্যই তারা মানুষের মনে ভয় ঢুকিয়ে দেয়। এই ক্ষমতা দিয়ে তারা যেকোনো বুদ্ধিমান প্রাণীর সঙ্গে ভাষা না জেনেও কথা বলতে পারে।

একধরনের মন্ত্রের মতো, ভাষা বোঝার শক্তি!

‘‘নাম ঠিকই পেয়েছো, ভীতু জন্তু! মৃত্যুর মুখে পড়ে নিজের সঙ্গীদের বিক্রি করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা নেই তোমার। সত্যিই নিজের নামের যোগ্য!’’

সোলোন এক মুহূর্ত চুপ করে, তারপর তার প্রত্যাশাময় দৃষ্টিকে উপেক্ষা করে দুই হাতে তরবারি উঁচিয়ে নির্মমভাবে কোপাল।

‘‘দুঃখিত, তোমার দেহই আমার কাছে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ!’’