উনচল্লিশতম অধ্যায় ঈশ্বরের বার্তা (প্রথমাংশ)
গম্ভীর পবিত্র নগরীর মধ্যে সবচেয়ে উঁচু এবং সবচেয়ে পবিত্র স্থাপনা নিঃসন্দেহে নগরীর কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত বিশাল পিরামিড। এটি সমগ্র পবিত্র নগরীর কেন্দ্রবিন্দু, এখানে কেবল ধর্মীয় সংস্থার সর্বোচ্চ ক্ষমতার প্রতীক প্রবীণ পরিষদের সভা কক্ষই নেই, বরং সর্বোচ্চ দেবত্বের প্রতিনিধি স্বর্গীয় দেবতার উপাসনালয়ও এই পিরামিডেই রয়েছে।
মহান পিরামিডের ভেতরে বাইরের তুলনায় অনেক বেশি শীতল ও ছায়াময়, অধিকাংশ জায়গায় নেই জানালা কিংবা আলো, কেবল জ্বালানো মোমবাতির আলোতেই চারপাশ আলোকিত হয়। পিরামিডের সর্বোচ্চ শিখরে স্বর্গীয় দেবতার উপাসনালয় অবস্থিত। কিংবদন্তি ও পুরাণে দেবতারা বাস করেন আকাশে, তাই এখানেই দেবতাদের সবচেয়ে কাছাকাছি পৌঁছানো যায়।
ঋতু-কমলিনী মোমবাতির ক্ষীণ আলোয় ঝলমলানো প্রশস্ত পথে ধীরে ধীরে হেঁটে চলছিলেন। সামনে-পেছনে কেউ নেই, দেখে মনে হচ্ছে যেন ছায়ায় মিশে যাওয়া এক রহস্যময় ছায়ামূর্তি। আজকের দিনে তার পোশাকও স্বাভাবিক দিনের চেয়ে আলাদা, নিঃশব্দ রঙের ঢিলেঢালা লম্বা পোশাক, চওড়া হাতা, তার আকর্ষণীয় অবয়বকে পুরোপুরি ঢেকে রেখেছে।
তিনি একদম পিরামিডের চূড়ায় পৌঁছে পাথরের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠলেন।
প্রবল হাওয়া তার মুখে এসে লাগল, তার পোশাক বাতাসে পতপত করে উড়তে লাগল। তার চোখের সামনে একটি সমতল বলিপীঠ, স্বর্গীয় দেবতার উপাসনালয়ের সবচেয়ে পবিত্র স্থান।
এখানে তার আগে আরেকটি ছায়ামূর্তি উপস্থিত, পিঠ তার দিকে, দূরের দিকে চেয়ে আছে। ঋতু-কমলিনী তার পেছনে গিয়ে তাকাতেই বুঝতে পারলেন, তিনি তাকিয়ে আছেন দেবতাগিরির দিকে।
ঋতু-কমলিনী নিচু স্বরে ডাকলেন, ‘‘গুরুদেব, আমি এসেছি।’’
তার গুরুই স্বর্গীয় দেবতার উপাসনালয়ের সর্বোচ্চ পুরোহিত, সমগ্র পবিত্র নগরী ও মানবজাতির মধ্যে দেবত্বের প্রধান প্রতিনিধি। অথচ এই মুহূর্তে, তার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন এক সদয় বৃদ্ধ।
মহাপুরোহিত সম্ভবত ঋতু-কমলিনীকে অত্যন্ত স্নেহ করেন। তাকে দেখে চোখে প্রশংসা আর মমতার ঝিলিক ফুটে উঠল, হেসে বললেন, ‘‘তুমি এসেছো কেন?’’
ঋতু-কমলিনী কিছুটা অসহায়ের মতো মহাপুরোহিতের জামার কঁচি ধরে বললেন, ‘‘গুরুদেব, আপনি তো সদ্যই গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন, শরীর এখনও পুরোপুরি ভালো হয়নি, এই ‘দেবতামঞ্চে’ এসে এই প্রচণ্ড বাতাসে থাকলে যদি আবার অসুখ ধরে, তখন কী হবে?’’
মহাপুরোহিত হেসে উঠলেন, ‘‘হোংয়া-রা কি তোমাকে পাঠিয়েছে?’’
ঋতু-কমলিনী ঠোঁট ফোলালেন, একটু বিরক্ত গলায় বললেন, ‘‘গুরুদেব! ওরা কেউই সাহস পায় না আপনাকে বোঝাতে, আপনি এভাবে চললে শরীর কি টিকবে?’’
মহাপুরোহিত মৃদু হাসলেন, দুই হাত চওড়া জামার ভেতরে রেখে আবারও দূরের দেবতাগিরির দিকে তাকালেন, ‘‘কিছু যায় আসে না, আমি জানি, আমার দিন ফুরিয়ে এসেছে।’’
ঋতু-কমলিনীর দেহ কেঁপে উঠল, সঙ্গে সঙ্গে আতঙ্কিত হয়ে উঠলেন, ‘‘গুরুদেব, আপনি কী বললেন?’’
মহাপুরোহিত তার কথার জবাব দিলেন না, বরং দূরের অস্পষ্ট দেবতাগিরির দিকে ইঙ্গিত করে শান্ত গলায় বললেন, ‘‘তুমি কি মনে করতে পারো, আমি তোমাকে দেবতাগিরির গল্প বলেছিলাম?’’
ঋতু-কমলিনী মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, জানলেন এক্ষুণি এই জেদি গুরুদেবকে ফেরানো যাবে না, তাই বললেন, ‘‘মনে আছে, আপনি বলেছিলেন, দেবতাগিরির ওপরে দেবতা আছেন।’’
‘‘ঠিক তাই।’’ মহাপুরোহিত নিজেই যেন আপনমনে বললেন, ‘‘আমি আজীবন দেবতার পূজা করেছি, তরুণ থেকে বৃদ্ধ হয়েছি, অথচ আজও কখনও তাকে দেখিনি, বা তার কণ্ঠ শুনিনি।’’
তাঁর মুখে যেন কিছুটা আক্ষেপ, কিছুটা হতাশা, কিছুটা অপ্রাপ্তি, তিনি তার প্রিয় শিষ্যা ঋতু-কমলিনীর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘‘কমলিনী, বলো তো, আমি কি যথেষ্ট আন্তরিক ছিলাম না, নাকি কোথাও কোনো ভুল করেছি?’’
ঋতু-কমলিনী অবিলম্বে মাথা নেড়ে বললেন, ‘‘গুরুদেব, এমন বলবেন না, সবাই জানে সমগ্র পবিত্র নগরী আর মানবজাতির মধ্যে আপনি দেবতার সবচেয়ে বড় ভক্ত, সবচেয়ে বেশি নিয়ম মানা, নির্ভুল, সবাই আপনাকে শ্রদ্ধা করে। আমি নিচে সাধারণ মানুষের মধ্যে ঘুরে বেড়াতে গিয়ে বহুবার শুনেছি, তাঁরা আপনাকে দেবতার দূত বলে, বলেন আপনি দেবতার অবতার, দেবতার মতোই পবিত্র।’’
মহাপুরোহিত মাথা নাড়লেন, ‘‘না, না, যদি তাই হতো, কেন দেবতা কখনও আমাকে কোনো অলৌকিক শক্তি দেখাননি?’’
ঋতু-কমলিনী কিছুক্ষণ চুপ থেকে বুঝতে পারলেন, কী বলবেন। মানবজাতির ইতিহাসে, কিংবদন্তি আছে, প্রথম সাধক-পুরুষের যুগে দেবতা অলৌকিক শক্তি দেখিয়েছিলেন, মানুষকে পথ দেখিয়েছিলেন, মানবজাতিকে উন্নত করেছিলেন। কিন্তু তারপর আর কেউ অলৌকিক শক্তি দেখেনি।
আসলে, প্রথম সাধক-পুরুষের অলৌকিক ঘটনারও কেউ সাক্ষী নয়; তিনি একা থাকাকালীন হঠাৎ দেখেছিলেন, এরপর উদিত হয়েছিলেন, সাধক হয়েছিলেন, মহান কীর্তির সূচনা করেছিলেন।
মহাপুরোহিত দূরে তাকিয়ে অনেকক্ষণ চুপ রইলেন, হঠাৎ ঋতু-কমলিনীকে ডেকে কাছে আসতে বললেন। ঋতু-কমলিনী পাশে গিয়ে বললেন, ‘‘গুরুদেব, কী হয়েছে?’’
মহাপুরোহিত বললেন, ‘‘দেবতাগিরিতে দেবতা আছেন, অন্তত দেবতার দেহাবশেষ তো আছেই, তাই তো?’’
ঋতু-কমলিনী কিছুটা ইতস্তত করে বললেন, ‘‘এটা সাধক-পুরুষদের কথা, যদিও কেউ কখনও দেবতাগিরি ছুঁতে পারেনি, তবে... সম্ভবত সত্যি।’’
মহাপুরোহিত ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন, চোখে উদ্দীপনার ঝিলিক, বললেন, ‘‘আমি আমার জীবন দেবতার চরণের তলে রেখেছি, এমনকি ত্রিশ বছর বয়সে দেবতার উদ্দেশ্যে মহান ব্রত নিয়েছি, তারপর পঞ্চাশ বছর মন্দির থেকে বের হইনি। এখন বার্ধক্যে দাঁড়িয়ে জীবনকে স্বপ্ন বলে মনে হয়, যেন কিছুই পাইনি। তাই যাই হোক, মৃত্যুর আগে আমি দেবতাকে দেখবই।’’
ঋতু-কমলিনী বিস্ময়ে চমকে উঠলেন, মনে এক অশুভ আশঙ্কা জেগে উঠল, নিচু গলায় বললেন, ‘‘গুরুদেব, আপনি কী করতে চান?’’
মহাপুরোহিত বললেন, ‘‘অন্তঃবৃত্তের স্বর্গীয় পথের কাজ কি আবার ধীরগতিতে চলছে?’’
ঋতু-কমলিনী মাথা নেড়ে বললেন, ‘‘হ্যাঁ, কারণ গতবার কালো দৈত্য পিঁপড়ে আক্রমণ করেছিল, অনেক হতাহতের ফলে শ্রমিক কমে গেছে, তাই কাজ ধীরগতিতে চলছে।’’
মহাপুরোহিত অনেকক্ষণ চুপ থেকে অবশেষে বললেন, ‘‘তুমি আমার হয়ে বার্তা দাও, তিনজন প্রবীণকে দেবতার মন্দিরের সভা ঘরে ডেকো, জরুরি আলোচনা আছে।’’
ঋতু-কমলিনী কিছুটা অবাক হয়ে তার দিকে তাকালেন, তবু রাজি হলেন।
তিনি দেবতামঞ্চ ছেড়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে গিয়ে আর একবার ফিরে তাকালেন। দেখলেন, মহাপুরোহিত এখনও তার দিকে পিঠ করে আছেন, যেমন তিনি ওপরে উঠেছিলেন ঠিক সেই ভঙ্গিতেই, যেন কখনও বদলায়নি, এখনও দূর আকাশ ছোঁয়া, মায়াবী দেবতাগিরির দিকে বিমূঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে।
※※※
যা দেবতার মন্দির নামে পরিচিত, মূলত পবিত্র নগরীর বিশাল পিরামিডের ওপরের অংশ; নিচের অংশে প্রবীণ পরিষদ এবং তাদের অধীনস্থ বিশ্বস্ত প্রশাসনিক দপ্তরগুলো। সাধক-পুরুষের বাণীতে বলা ছিল, যারা দেবতার সেবা করে, তাদের উচ্চস্থানে থাকতে হবে, সাধারণের কোলাহল থেকে দূরে।
মানবজাতির তিন প্রবীণ প্রবেশ করলেন দেবতার মন্দিরের সভা ঘরে। অন্যান্য স্থানের চেয়ে এখানে বড় জানালা রয়েছে, তাই আলো উজ্জ্বল, প্রাচীন স্থাপনায় সাদামাটা ও গম্ভীর পরিবেশ, দেবত্বের প্রতীক বলিপীঠে অনন্তকাল ধরে জ্বলছে অগ্নিশিখা।
মহাপুরোহিত এখনও সামনে বলিপীঠের কাছে ধ্যানস্থ, ঋতু-কেতু, দ্রাগনঝরণা এবং গ্রীষ্মরাজ্য এই তিন প্রবীণ সভাকক্ষের মাঝখানে মেঝেতে বসলেন। পুরো সভাঘরে তাদের চারজন ছাড়া কেবল ঋতু-কমলিনীই রয়ে গেলেন, চা-পানি পরিবেশন করছেন, পাশাপাশি তার অনন্য মর্যাদার প্রতীকও।
ঋতু-কেতু তার কন্যার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে মাথা নেড়েছেন, মুখে আনন্দ চাপা থাকেনি।
পাশের দ্রাগনঝরণা ও গ্রীষ্মরাজ্য কিছুটা ঈর্ষাপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন। গ্রীষ্মরাজ্য বলে উঠলেন, ‘‘আহা, কেতু ভাইয়ের ভাগ্য তো দেখাই যাচ্ছে, এত ভালো মেয়ে জন্মেছে।’’
দ্রাগনঝরণা মাথা নেড়ে বললেন, ‘‘ঠিক বলেছেন, দেখুন তো কমলিনীকে, আর আমার ছেলেগুলোর কথা ভাবলে রাগে মরে যেতে ইচ্ছে করে।’’
ঋতু-কেতু হেসে বললেন, ‘‘আবার শুরু করলেন তো! শোনো, তোমরা আশা ছেড়ে দাও, আমি কোনোদিনও কমলিনীকে তোমাদের ঘরের বউ হতে দেব না।’’
‘‘এই!’’
দ্রাগনঝরণা আর গ্রীষ্মরাজ্য হেসে ধমক দিলেন। সভাকক্ষে বহিরাগত কেউ নেই, এই তিনজন—যারা পবিত্র নগরীর সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী—এই মুহূর্তে যেন সাধারণ পিতার মতোই, নিজেদের সন্তানদের নিয়ে হাস্য-পরিহাস করছেন, পরবর্তী প্রজন্মের বিয়ের চিন্তায় মগ্ন।