চুয়াল্লিশ ফিরে আসার পথ (এক)
শ্বেতবাঘ কিছুটা হাসল, কিন্তু কোনো উত্তর দিল না, এতে শ্বেত রাক্ষস কিছুটা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ল। এরপর শ্বেতবাঘ বলল, ‘‘জানি না।’’
‘‘তুমি জানো না অথচ বলছো এটা仙人 এর অলৌকিক বস্তু, প্রাচীন যুগের নিদর্শন, এত বড়াই করলে?’’
‘‘কিন্তু আমি সত্যিই জানি না, কেবল সত্য কথাটাই বলতে পারি।’’, শ্বেতবাঘ মাথা নাড়ল, যেন বলছে, ‘‘তুমি কিছুই করতে পারবে না’’।
‘‘তাহলে তুমি জানলে কিভাবে এটা仙人 এর ধন?’’
‘‘আমি নিজে仙人 কে এটা ব্যবহার করতে দেখেছি, এটা এক ধরনের সহায়ক ধন, তবে এখন তুমি কতটুকু ক্ষমতা জাগাতে পারবে তা বলা মুশকিল।’’ শ্বেতবাঘ চোখ আধবোজা করে রহস্যময় ভঙ্গিতে বলল।
‘‘তুমি যদি এই প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারো, তাহলে তুমি কেমন পশুর রাজা? তাহলে অন্য কোনো প্রশ্নের উত্তর কি পারবে দিতে?’’
শ্বেতবাঘ বরাবরই প্ররোচনায় দুর্বল, একটু উত্তেজিত হলেই ফাঁদে পড়ে, সঙ্গে সঙ্গে বলল, ‘‘যদি আমি কিছু জানি, তাহলে অবশ্যই বলব!’’
‘‘তাহলে বলো, আমরা যখন এখানে এলাম তখন সময়ের সঙ্গে এক মাসের পার্থক্য হল কেন? আমরা চারজনই ঘূর্ণির মধ্যে পড়েছিলাম, কিন্তু যদি আমরা ঘূর্ণির মধ্যে থাকতাম, তাহলে কীভাবে এক মাস ধরে বেঁচে থাকতে পারতাম? আর আগের দুইজন তো দুই মাস ছিল।’’
শ্বেতবাঘ নিজের থাবা চেটে বলল, ‘‘এই প্রশ্নের উত্তর কঠিন নয়। বাইরের জগত প্রাণশক্তিতে পূর্ণ, সেখানে প্রবেশে কোনো সংখ্যার সীমা নেই, তবে এখানে ঢুকতে হলে দরজা খুলে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হয়।
এ সময়ে তোমরা সবাই এক সময়-ফাটলের মধ্যে বিশ্রাম নেবে; সেখানে প্রচুর প্রাণশক্তি থাকে, যার যত বেশি প্রতিভা, তার শরীরে তত বেশি শক্তি প্রবেশ করবে। শক্তি পূর্ণ হলেই বাইরে আসা যাবে।
তবে এখানকার দরজা নিজের নিয়ম মেনে চলে, মাসে একবার খোলে, আর একবারে দুজন, যে আগে আসবে সে আগে যাবে।’’
‘‘তাহলে আমরা যখন বাইরে যাব, বাইরের দরজায় কোনো বাধা না থাকায় সঙ্গে সঙ্গেই মূল জগতে ফিরে যাব, আবার সময়-ফাটলে পড়ব না তো?’’
শ্বেত রাক্ষস প্রশ্ন করল।
শ্বেতবাঘ একবার তাকাল, তারপর আবার মন দিয়ে থাবা চাটতে লাগল, ‘‘তুমি বেশ বুদ্ধিমান মেয়ে।’’
শ্বেতবাঘ নিজের মাথা ও কান থাবা দিয়ে পরিষ্কার করল, কিছুক্ষণ পরে আবার বলল, ‘‘আমরা既然 এত ভাগ্যবান, আমি তোমাদের আরও একটি খবর দিতে পারি।’’
শ্বেত রাক্ষস সঙ্গে সঙ্গে তাকাল, ‘‘বাঘরাজ, দয়া করে বলুন।’’
শ্বেতবাঘ মনে মনে বলল, ‘‘কাজ থাকলেই আমায় ডাকো, না থাকলে কোনো সম্মান নেই, আহা, আজকালকার ছেলেমেয়েরা!’’
তবে既然 কথা দিয়েছে, বলবেই। শ্বেতবাঘ বড়ো লেজ চারজনের সামনে একবার ঝাড়ল, হঠাৎ পরিবেশ ভারী হয়ে উঠল, তারপর বলল, ‘‘বাইরের সময়ের গতি আসলে ভেতরের থেকে আলাদা, নির্দিষ্ট হিসেব মনে নেই, তবে তোমরা যখন ঢুকেছিলে, আনুমানিক দুই মাস তো হয়ে গেছে?’’
এবার সু চাংইয়ান মুখ খুলল, ‘‘দুই মাস পুরো হয়েছে।’’
শ্বেতবাঘ মাথা নেড়ে বলল, ‘‘তোমরা যখন বের হবে, তখন বাইরে হয়তো তিন বছর কেটে গেছে।’’
কি! তিন বছর!
‘‘ভয় পেও না, এখানে যা পেয়েছ, বাইরে ত্রিশ বছরেও পেতে না, তিন বছরই বা কি? চিন্তা কোরো না।’’
দুজনের বিস্মিত মুখ দেখে শ্বেতবাঘ আরও গর্ব করে বলল, ‘‘তাই কে আগে যাবে, সেটা ভেবে নাও, কারণ তোমরা চারজন।’’
আগে শুনেছিল মাসে দুইজন যেতে পারে, সুতরাং মনস্থির করা ছিল, একজন এক শিশুকে নিয়ে যাবে, কে আগে যাবে তা বড়ো কথা নয়, চাইলে পরে যাওয়া বাইরে অপেক্ষা করবে।
কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে শুধু মাস নয়, বাইরে অপেক্ষা করতে হবে পুরো এক বছর, এতে পরে যাওয়া কারও জন্যই ন্যায্য হবে না, দুজনেরই তাড়াতাড়ি বের হবার কারণ আছে।
তিন বছর—ইয়ান সাপ সু চাংফেং-এর ছদ্মবেশে বাইরে তিন বছর কাটাল, কী যে ঘটেছে কে জানে। সু চাংইয়ানকে দ্রুত বের হয়ে সবকিছু সামলাতে হবে।
তিন বছর—চলে আসার আগে গুরুজির কবরের সামনে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, প্রতি বছর ফিরে এসে শ্রদ্ধা জানাবে, এখন তিন বছর গেল, পাহাড়ে বরফ পড়ে থাকে, কে জানে গুরুজির কবর কেমন আছে।
তার ওপর, আত্মার বিভ্রমে সে ঠিক করেই নিয়েছে, গুরুজির শেষ শিক্ষাগ্রন্থ সংগ্রহ করে অবশ্যই নিজের প্রাপ্য ফেরত নেবে।
শ্বেত রাক্ষস আর সু চাংইয়ান একে অপরের দিকে তাকিয়ে দুজনেই অপরের উৎকণ্ঠা বুঝে নিল, শ্বেতবাঘ এমন দৃশ্য দেখে বেশ মজা পেল, আয়েশ করে ফেইফেই-র হাতের মালিশ উপভোগ করতে লাগল।
মানুষের ছেলেমেয়ে, স্বার্থের মুখে কি তোমরা এবার ঝগড়া করবে? মনে মনে ভাবল শ্বেতবাঘ।
শ্বেতবাঘ চোখ আধবোজা করে আয়েশ করছে, আবার গোপনে দুজনকে লক্ষ্যও করছে।
এমন সময়, সু চাংইয়ান একটু অন্য প্রশ্ন করল, ‘‘শ্বেতবাঘ মহারাজ কেন আমাদের চাঁদ বাড়ির উত্তরাধিকারীদের স্মৃতি দিলেন? চাঁদ পরিবারের উত্তরসূরিদের ব্যাপারে আপনার অনুভূতি কী?’’
শ্বেতবাঘ ভাবেনি, এই নম্র ছেলেটি এমন তীক্ষ্ণ প্রশ্ন করবে, কিন্তু এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।
‘‘যদি চাঁদ পরিবারের উত্তরসূরি এসে বেদীর সিল ভাঙত না, আমি চিরকাল এই গুহায় বন্দি থাকতাম, বের হতে পারতাম না। আর যদি তারা আসে, আমি আবার স্বাধীনতা পেতাম, এই অলৌকিক অরণ্যে ঘুরে বেড়াতে পারতাম, ঠিক নয়, পাহারা দিতাম।
একশ বছর হয়ে গেছে, সেই মেয়েটিকে কথা দেয়ার পর এই প্রথম চাঁদ পরিবারের কেউ এখানে এল। শত বছর যেন চোখের পলকে কেটে গেল, অথচ এই গুহায় এতদিন কাটিয়ে আমারো এবার মুক্ত বাতাসে হাঁটতে ইচ্ছে করছে।’’
শ্বেত রাক্ষস হঠাৎ প্রশ্ন করল, ‘‘বাঘরাজ কি চাঁদ পরিবারের উত্তরসূরিদের এক মাস দেখাশোনা করতে পারবেন? আমরা বাইরে এক বছর কাটিয়ে এসে তাদের নিতে পারব?’’
ফাংফাং একটু ভয় পেয়ে গেল, এতদিন ভাই-বোনদের সঙ্গে ছিল, হঠাৎ একা পড়ে যাবে বলে মনটা ফাঁকা লাগল।
ফেইফেই বরং খুশি হল, কারণ বড়ো বিড়ালটার সঙ্গে এত তাড়াতাড়ি বিচ্ছেদ হলে মন খারাপ হয়ে যেত, এখন যদি আরও এক মাস থাকতে পারে, দারুণ হবে।
শ্বেতবাঘ একটু ভেবে বলল, ‘‘তাদের দেখাশোনা করতে পারব, কিন্তু তোমরা যদি এক বছর পর না আসো, ওই জগৎ খুবই বিপজ্জনক।’’
সু চাংইয়ান সঙ্গে সঙ্গে বলল, ‘‘আমি জীবন দিয়ে শপথ করছি, কোনো বাধাই থামাতে পারবে না, ফাংফাং আর ফেইফেই-কে নিতে অবশ্যই ফিরব। না পারলে সমস্ত শক্তি হারিয়ে, শরীর ভেঙে মৃত্যু হবে।’’
শ্বেত রাক্ষসও বলল, ‘‘আমার তেমন জরুরি কিছু নেই, বাইরে কাজ শেষ হলেই গুপ্তপথের মুখে বসে থাকব, বছর পূর্ণ হলে অপেক্ষা করব।’’
শ্বেতবাঘ মাথা নেড়ে একটু ভাবল, তারপর হঠাৎ থাবা নাড়াল, ফেইফেই ও ফাংফাং-এর মাথা থেকে কয়েকগাছি চুল তুলে ডেকে পাঠাল, একটি করে চুল তুলে বলল, ‘‘দুজনেই হাত বাড়াও।’’
দুজন চুপচাপ হাত বাড়াল। শ্বেতবাঘ থাবা দিয়ে তাদের হাতের ওপর ছোট্ট একটা চিহ্ন এঁকে দিল।
‘‘এটা কী?’’ শ্বেত রাক্ষস জিজ্ঞাসা করল।
‘‘ওরা ফেরার সময় হলে তোমাদের হাতেই বুঝতে পারবে, তখন দ্রুত চলে এসো।’’
‘‘অনেক ধন্যবাদ, মহারাজ।’’ সু চাংইয়ান মাথা নিচু করে কৃতজ্ঞতা জানাল।
শ্বেতবাঘ খুশি মনে ধন্যবাদ গ্রহণ করল, মনে মনে ভাবল, এই ছেলেটি পরিস্থিতি বোঝে।
এরপর অনেকক্ষণ গল্প হল, সবার পেটে তখন খিদে, একে একে শ্বেতবাঘের দিকে তাকাল।
ফেইফেই-ই প্রথম বলে উঠল, ‘‘বড়ো বিড়াল, আমি খুব ক্ষুধার্ত।’’